অধরা মাধুরী

(বর্ণময় অন্তরালে)

পর্ব ৪-৬

  পর্ব ৭-  

 

© সংরক্ষিত

 

ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব (১-৩)

 

সুপ্রতীক অরূপ ঘোষ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজ লেখকের পরীক্ষা। সারাদিন কাজের মধ্যে থেকে মনেই ছিলনা লেখক এক গুরু দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছিলেন আজ থেকে বছর দুয়েক আগে আর আজ তার চরম পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে! আজই দুপুরে স্পীড পোস্টে এসেছে খামটা। সারাদিন কাজের ফাঁকে এতসব মনে পড়েনি।

 

রাত এখন একটা। ডিনারের পর সেই রাত সাড়ে দশটা থেকে বেশ অনেকবার পড়েছে খামের মধ্যে সুন্দর হাতের লেখায় সাজানো সেই অধরা মাধুরী মধুরার রচনাবলী যা তাঁর কাছে মাধুকরী। কি করবে এখন এই লেখাগুলো নিয়ে লেখক!

ঠিক কি ভাবে শুরু করবে ভাবছে  সুবুদ্ধি। সুবুদ্ধি সেনশর্ম্মা। পঞ্চাশোর্ধ এক যুবক। একজন প্রোথিতযশা মানুষ। ব্যাঙ্গালোর শহরে তিনি এক সন্মানিত ব্যাক্তি। বানিজ্যিক শিক্ষাসমাজে তাঁর কদর বেশ উঁচুতলায় হয়ে থাকে। তিনি একাধারে একজন ইঞ্জিনিয়ার, ম্যানেজমেন্ট পেশাদার, সাহিত্যপ্রেমিক লেখক, একাগ্রচিত্ত শিক্ষক, ঘরোয়া রাঁধুনী, পেশাদার অভিনেতা আবৃত্তিকার এবং সর্বোপরি এক কবি যা তাঁকে অনেকের ভালবাসায় ভরিয়ে রাখে। সেই ভালবাসার মানুষের মধ্যে নারী পুরুষ সমবর্তমান। আর গাড়ী নিয়ে হাইওয়েতে ১২০-১৪০ এর কাঁটা না দেখলে তিনি ঠিক মনে করেননা যে গাড়ী চালিয়েছেন। সেই তিনি এখন বসে বসে ভাবছেন এই -ধরা কে কি করে ধরা যায়, তার অব্যক্ত কথাকে কি করে প্রাণ দেওয়া যায়?

 

এই লেখা লিখতে গিয়ে মানবজমিনের শুভবুদ্ধি সুবুদ্ধির সামনে কিছু প্রশ্ন রেখেছে। সেগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে প্রায় তিন ঘন্টা কেটে গেছে। লেখা শুরু হয়নি। সুবুদ্ধি   চেষ্টা করে একজন স্বচ্ছ মনের মানুষ হিসেবে নিজেকে দেখতে। তার নিকট দূরে অনেক বন্ধুত্বের আশীর্বাদের ঘেরায় সে থাকতে ভালবাসে। থাকেও। সে কোনও কাজ করার আগে ভাবে – ‘এটা কি ভাল কারও জন্যেও?’ বাএটা কি ক্ষতিকারক কারও জন্যেও?’ এই প্রশ্নদ্বয়ের উত্তরই তার পাথেয়। সুবুদ্ধি   কারও  ক্ষতি করতে পারে একথা কেউ বলেনি আজও। কেউ ভেবেছে কিনা তাঁর জানা নেই। কিন্তু কোনও অন্যায়ের দৃঢ প্রতিবাদ করার জন্য সে প্রায়ই অপ্রিয় হয়ে থাকে। তাতে তার কিছু যায় আসেনা। সে যখন পেশাদারী জমিতে দাঁড়িয়ে শেখায় বা পড়ায় তখন সবাই অবাক হয়ে ভাবে কি করে একজন মানুষ কোনও কিছুর সাহায্য ছাড়াই তিন দিন বা চার দিন ধরে একটানা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়িয়ে যান এবং তা বেশ মনযোগ দিয়ে সবাই শেখেন। সুবুদ্ধি নিজে খুবই আধুনিক মনের মানুষ কিন্তু পড়ানোর সময় এই কম্পিউটার, প্রজেক্টার বা আরও নানাবিধ যন্ত্রাদির ব্যবহার তাঁর মনঃপুত নয়। ওতে নাকি একাগ্রতার  ঘাটতি হয়। এই নিয়ে নবপ্রজন্মের সাথে একটা নির্বাক বিবাদ আছে। তাঁর ধারণা যন্ত্রপাতি মানুষের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সাহিত্য সৃস্টি। সুবুদ্ধি আজ খুব খুশী আবার কেমন যেন অন্যমনস্ক। ঠিক কি চলছে তাঁর   মনের মধ্যে বোঝা মুশকিল।

 

আজ অধরার প্রথম চিঠি এসেছে স্পিড পোস্টে। মিসেস অধরা চৌধুরী। বিয়ের আগে অধরা দাশগুপ্ত ছিলেন। অধরা কে সুবুদ্ধি আজও দেখেনি। কিন্তু তাকে তিনি চেনেন তার নিজের মনের আয়নায়খুবই স্বচ্ছভাবে তাঁর হাতের রেখার মতই অধরা তাঁর কাছে স্বচ্ছ। অধরার সাথে আলাপ ইন্টারনেট ভ্রমণে মধ্যে দিয়ে। সুবুদ্ধির স্ত্রীও জানেন নাগপুর আর ব্যাঙ্গালোরের মাঝে এক মানস-সেতুর ভিতপুজো হয়েছে দুবছর আগে। বন্ধুত্বের কি কোনও ভৌগলিক সীমা টানা যায়? প্রথম দিকে খুবই হালকা এক পরিচয় ছিল অধরার সাথে। অধরা বিবাহিতা, ষোড়শী কন্যার মাতা, তার স্বামী নাগপুরে বিশাল এক বিদেশী ব্যাঙ্কের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অধরা খুব ভাল গান গায়। উস্তাদ নিছাবর আলী খানের ছাত্রী। বেশ কিছুদিন পন্ডিত সুজয় চক্রবর্তির কাছেও তালি নিয়েছেন। টেলিফোনে দুএক কলি শুনেই সুবুদ্ধি বুঝেছিল এই প্রতিভা খুন্তি নেড়ে আর ফরমায়েশি সাজগোজ করেই জীবন শেষ করে দিচ্ছে। পরিচয়ের পর বেশ কিছু দিন যাবার পরে সুবুদ্ধি বেশ গার্ডিয়ান এর মত কথা বলার জায়গায় পৌঁছে যায়। কি করে? সেটাই হল সুবুদ্ধি সেনশর্ম্মার ব্যাক্তিত্বের প্রভাব। অধরার স্বামী বিক্রম চৌধুরীর সাথেও পরিচয় হয়েছে সুবুদ্ধির। বেশ রসিক মানুষ। উনি বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রীতে ছিলেন জীবনের শুরুতে। জীবনের সব সুখ উপাদানে তার রোজনামচা সাজানো। খুব মিশুকে মানুষ। তবে বেশ মেজাজী মানুষ। চ্যাটে বা টেলিফোনে কথা বলে সুবুদ্ধি একটা ছবি তৈরী করেছে বিক্রম অধরার। বিক্রম খুব দাপুটে স্বামী। প্রথমে এক বর ছিল। এখন কি সে দুটো বর (বর্ব্বর)? কথাটা ভেবেই হাসল সুবুদ্ধি। অধরা যথার্থ সুন্দরী, বিদুষী গুণী মহিলা।

 

অধরা বা সুবুদ্ধি কেউই কোনও দিন উন্মুক্ত হয়ে এগিয়ে না এলেও এটা বুঝে নিতে ওদের কোনও অসুবিধা হয়নি যে ওরা একে অপরের প্রতি এক নিঃস্বার্থ ভালবাসা অনুভব করে। তাদের মধ্যে  এক অব্যক্ত মানসিক আদান প্রদান আছে। কিন্তু আজও কেউ কাউকে দেখেনি। সেই আকুল তাগিদ অনুভব করলেও প্রকাশ করেনি কেউই। এমনকি ছবি আদান প্রদানও হয়নি। এক প্রাপ্তমনস্ক অনুভবের ঘেরাটোপের মধ্যে দুজন বাস করে। অধরা হল মানস প্রেমিকা আর সুবুদ্ধি? সে কি বুদ্ধি দিয়ে ভালবাসে? নাকি তার ভালবাসা অব্যক্ত? কবি সে। তার মন পদ্মপাতায় ধরা জলে অধরার মুখ দেখে। এই সব প্রশ্নের ঝড়ে প্রায় তিন ঘন্টা ধরে বসে বসে ভাবছেকি করা উচিত এখন? লিখতে উব্ধুদ্ধ করেছিল যখন তখন কি তাহলে সুবুদ্ধি ধরেই নিয়েছিল যে অধরা লিখবেনা?

 

সুবুদ্ধি বিবাহিত। তার একটি   ঊনিশ বছরের ফুটফুটে মেয়ে আছে শুভশ্রী। তাঁর স্ত্রী তপশ্রী আই এস অফিসার। প্ল্যানিং কমিশনের মেম্বার সেক্রেটারী। ওঁরা দূরে দূরেই কাটিয়েছে জীবনের অনেকটা সময়। আত্মীয়স্বজন বন্ধুরা বলে উড়ন্ত পরিবার। তপশ্রী যদিও ব্যঙ্গালোরে পোস্টেড কিন্তু প্রায়ই দিল্লি যেতে হয় ওঁকে। অধরা ইংলিশে এম- করার পর মাস্টার অফ করে আজ