অধরা মাধুরী

(বর্ণময় অন্তরালে)

পর্ব ১-৩

পর্ব ৪-৬

 

 

 

© সংরক্ষিত

সুপ্রতীক অরূপ ঘোষ

 

ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭-

 

কান্তকবি সুকান্তের এক কষ্টোক্তি দিয়ে এই অধ্যায় শুরু। বসন্তের কোকিল কেশে কেশে রক্ত তুলবে, সে কিসের বসন্ত? বসন্তের কোকিল হয়ত সে নয়। কিন্তু বরাবরই সে কন্ঠনির্ভর। প্রগলভ নয় তবে সে বিষয়সমৃদ্ধ। কথা, বলার থেকেও ভাবা বেশী। সেটাই তার পেশা। সেই সুবুদ্ধির কথা বন্ধ হয়ে গেছে। কি করে? গলার ওপর অত্যাচার সেই ছাত্র জীবন থেকে। স্লোগান মুখী শানান সংগীনের মত ঝলক দিয়ে উঠত সেই চোদ্দ বছর বয়েস থেকে। মনের মধ্যে সেই দুর্দ্দাম প্রতিবাদী কন্ঠ এখনও দুন্দুভি বাজায়। প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, প্রতিশোধে কমরেড, গড়ে তোল গড়ে তোল গড়ে তোল ব্যারিকেড,আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী, জীবনে মরণে সেকথা কি আমি কখনও ভুলিতে পারি? এই তো সেদিনের কথা। তাই কি? ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৪ দীর্ঘ পনের বছর সুবুদ্ধি এই নিয়েই দিন কাটিয়েছে। মনের ভেতর একটা চাপা কষ্ট আছে। মনের কষ্ট মনে রেখে সে এখনও কাজ করে যায়। এখন মন মাঝে মাঝে খুব ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। ওর থেকে ওর স্ত্রী’র মন বেশী ভারাক্রান্ত এই নির্বাক সুবুদ্ধিকে দেখে। ঘর ছাড়া পর ঘেরা জীবন সুবুদ্ধির বয়ঃসন্ধি কাল থেকেই। তার পর দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের ওপর গড়ে দিনে আট থেকে দশ ঘন্টা ক্রমাগত কথা বলা, পড়ানো, বোঝানো, নীরবতা ছিলনা তার জীবনে প্রায় চার দশক ধরে। কিন্তু আজ সে নীরব। কন্ঠ তাহার রুদ্ধ আজিকে। বাঁশী তো ছিলই না জীবনে কখনও তাই বাঁশী সংগীতহারা হবার প্রশ্ন ওঠেনা। বন্দুকের গুলির আওয়াজ এখন আর তাকে টানেনা, বন্দুকের নলই হল প্রকৃত শক্তির উতস একথা যে ভুল তা’সে বুঝেছে বহুকাল আগে। কিন্তু বাকরুদ্ধ সুবুদ্ধির কলমের শক্তি আছে। বাকশক্তিতে সে বিশ্বাস করে এখনও কিন্তু কথা বলতে পারেনা। আজ তার বাকশক্তি নিঃশব্দ নীরব কিন্তু তার কলম রুদ্ধ হয়ে যায়নি। সাময়িক থেমেছিল। তাই আবার কলম ধরেছে সুবুদ্ধি...  

আজ অনেক দিন পরে সুবুদ্ধি লিখতে বসেছে। মাঝের ক’টা মাস সুবুদ্ধির কেমন গেছে সে’ কেবল ঈশ্বরই জানেন। এখনও খুব একটা ভাল নয়। শরীর ও সেই সংক্রান্ত নানান ঝামেলায় লেখা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভাবনাগুলো আসে আর যায় কিন্তু লেখা আর হয়না। তাই এক শনিবারের সন্ধ্যার সব কিছু এমনকি ঘড়ি ধরা বিশ্রামও বাতিল করে লিখতে বসেছে সুবুদ্ধি। ধরার সব নিয়ম বদলে গেছে সুবুদ্ধির জীবনে গত ছ’মাসে।

ইতিমধ্যে অনেক চিঠি এসেছে অধরার। কত কথা সে বলতে চেয়েছে। কিছু চিঠি এখনও খোলাই হয়ে ওঠেনি। সুবুদ্ধি খুব লজ্জিত বোধ করছে। ধীরে ধীরে অধরার না পড়া একটা চিঠি খুলে প্রথম পাতায় আটকে গেছে সে।

বর্ণময় অন্তরালে থাকা এই নাম না জানা বিদূষী মহিলা কি করে এতদিন ধরে এই সুপ্ত প্রতিভার বর্ণচ্ছটার ওপর ধুষর রঙ মেখে বসে আছে! অধরার চিঠিতে সাধারণত একটা সম্বোধন থাকে। আজ সেখানে একটি কবিতা –

 

 

হারানো সুর

ছিঁড়ে যাওয়া তানপুরার তারে

সুর গিয়েছে সরে সরে

কেন তারে নতুন করে

নতুন তারে বাঁধতে যাওয়া

পরিপূর্ণ বিশ্বাসে আর

আবেগঘন আশ্বাসে

ফিরে কি কখনও পাবে

সে তার পুরোন চাওয়া পাওয়া

শ্বাসরুদ্ধ দমবন্ধ সারাদিন

তানপুরা করুণ হেসে বলে

সুরস্থব্ধ আমি আজ রঙহীন

কবে হব, হব কি আবার রঙ্গিন

কথা দিতে পারিনে ভাই

তোমার সাথে দুটো কথা কব

সে সময়ও নাই

তবে জেনো তুমিই আমার সব

বেশতো ছিলে নীরব

বৃথা কেন এ কলরব!

 

কত না বলা কথা! কত যন্ত্রণার কথা না বলে অধরা বলে দিয়েছে! এরপর অধরার কলমে তার বর্ণময় অন্তরালের কথা।

 

আমার পরম আরাধ্য মহাশয়,

এর মাঝে বেশ অনেকগুলো চিঠি লিখেছি আপনাকে। কিন্তু আপনি নীরব! কেন জানিনা। সব ভালতো? জানিনা কারণ আপনার খবর জানার কোনও উপায় নেই। অধিকার আছে কি? জানিনা। আমি তাই আমার কথাই বলে যাই। একমুখী আলাপ। আলাপ বলতেই বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। আপনাকে দেওয়া কথা হয়তো আর রাখা গেলনা। তাই আলাপ কথাটা শুনলেই কেমন দমবন্ধ লাগে।

সুর তাল কথা ও লয়

হারিয়েছি এসবের সমন্বয়

জীবন হলোই বা বিষময়

সংগীত তবু সদা অক্ষয়।

কিছু বুঝলেন? আমার গান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি চুপ! বিশ্বাস করি আজও বন থেকে পাখীকে তুলে খাঁচায় রেখে তাকে স্তব্ধ করে দেওয়া যেতে পারে কিন্তু পাখীর মন থেকে সবুজের ইন্ধনে আর নীলের জ্বালানীতে জন্ম নেওয়া সংগীত বন্ধ করে দেওয়া যায়না। মানুষকে গান শিখিয়েছিল তো পাখীরাই। তাই না? তাই আমি চুপ আমার মন পাখীর গানকে নীরবে উপোভোগ করি আমি। আর ভাবি আবার একদিন আমি গান গাইব। আমি যে একজনকে কথা দিয়েছি। সে কথা যে আমায় রাখতেই হবে।    

সুবুদ্ধি একটু থেমে মুচকি হাসল। তার কথা বন্ধ আর অধরার গান বন্ধ। দুটো ঘটনা একই সময়! অন্ততঃ দেরীতে খোলা চিঠি পড়ে তাই মনে হচ্ছে! দুটো কি কাকতালীয়? দুটো একই ব্যাপার কি? কে জানে!

আমার বর্ণময় অন্তরালে থাকার বর্তমান চেহারাটা এইরকম। আমি এখন আর গান শিখতে যেতে পারিনা। নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক পন্ডিত পুরুষোত্তম কেলকারজী আমার গলা শুনে বিনা দক্ষিণায় আমাকে আবার আমার তানপুরা ধরায় ব্রতী করে তুলেছিলেন। আবার গান শেখা শুরু করতে আপনি যে সাহস জুগিয়েছিলেন তাতে গুরুজীর আশ্বাস আমাকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। বাদ সাধল আমার সংসার। আমার স্বামী বিক্রমের দৃঢ় বিশ্বাস যে আমি মেয়েকে অবহেলা করছি। অথচ এই মেয়ের জন্যেই আমি আজও এই সোনার খাঁচায় নির্বাক বন্দিনী হয়ে আছি। আমি শুধু শনিবার সকালটুকু গুরুজীর কাছে যেতাম। শনিবারের সকালের কয়েক ঘন্টা আর মাঝে সময়ের ফাঁকে ফোঁকরে একটু রেওয়াজ এই করেই গানের মোরামে ফিরে আসছিলাম আমি। আমার নাকি অনেক গুনমুগ্ধ তৈরী হচ্ছে! সেই কারণে বিক্রমের অক্ষম গোঙ্গানী এখন ক্রুদ্ধ আক্রমনে পরিণত হয় প্রায়ই। অথচ এই চল্লিশের বিষাদে ভরা মনের মাঝে প্রশস্তি বাক্য শোনার কোনও অভিপ্রায় নেই। যার কথা বুকে তুফান তুলতে পারত সেতো আমার জীবনে আসেইনি। আমি কি করে গুনমুগ্ধদের খেয়াল করব! গান শিখতে যেতে আসতে কিছু খরচ আছে। সেই খরচও বন্ধ হয়েছে। অনেকটা আমার সামাজিক পরিচয়ের জগত থেকে আমাকে দূরে রাখতেই এই প্রচেষ্টা। বিক্রম আজও একটা ইন্সিকিউরিটিতে ভোগে। ঘরে সুন্দরী বৌ থাকলে সব পুরুষেরই কি এই এক সমস্যা? নারীর সম্ভ্রম বোধের ওপর পুরুষের কি কোনও আস্থা নেই? না কি থাকতে নেই? জানিনা...

আমি কেবল এখন বালিশে মুখ রেখে চোখের জল রোধ করি আর কল্পনায় আমার মায়ের গলার গানগুলো মনের তানপুরায় শুনি আর ভাবি না কিছু ভাবিনা। ভাবা আমার অধিকারের মধ্যে পড়ে কি?

জীবন এখন অন্য খাতে বইছে। মেয়ে বড় হয়েছে। ক্লাস টেন পাশ করল খুব ভাল রেজাল্ট করেছে। ৯৪% পার্সেন্ট নিয়ে পাশ করেছে। ওর ইচ্ছে জার্নালিজম পড়বে। ভাল একটা জুনিয়র কলেজে ভর্তি হয়েছে। মেয়েকে গান শেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ভীষ ভাল গলা ওর কিন্তু মস্ত ফাঁকিবাজ। কিছুতেই রেওয়াজ করবেনা। কেবল বলে মা তুমি গাও আমি তুলে নেব। ও বোঝেইনা ওর মায়ের গান ওর বাবার চক্ষুশুল। ও এখনও বোঝেইনা সংগীত হল সাধনার জিনিষ। শ্রুতিধর গায়ক হয়না যে তা নয় কিন্তু তারও চর্চার প্রয়োজন। আপনি খুব ভাল বোঝাতে পারেন। কাছে থাকলে হয়ত তিতলিকে একটু গাইড করতে পারতেন। ও আপনার কথা খুব বলে। আপনিতো বিক্রমকেও টেলিফোনে কনভিন্স করেছিলেন যাতে আমার আবার গানের চর্চা শুরু হয়। আপনি অসাধ্য সাধন করেছিলান। কিন্তু আপনি যে কোথায় হারিয়ে গেলেন! জানিনা।

বিক্রম ব্যাঙ্কের চাকরীটা ছেড়েছে। ঠিক কি হয়েছিল জানিনা। তবে হঠাতই সব ঘটে গেল। একদিন অফিস থেকে এসে বলল, কাল থেকে আর অফিস যাবনা। ভাবছি ফাইন্যান্সিয়াল কন্সাল্ট্যান্সি করব। অনেক ভাল হবে” একদমে কথা গুলো বলেই বিক্রম বুঝল আমি শীতলতার অতলে হারিয়ে গেছি কখন। এত অনিশ্চয়তা দেখেছি এই সতের বছরে যে আজ আর কোনও কিছুই ভয় দেখাতে পারেনা। তবু ওর তাতে কিছু যায় আসেনা। বলল, খুব ভাল করে কষা মাংস রান্না করতো আজ সঙ্গে লাচ্ছা পরঠা আর স্যালাড। আমি জানি আমার হেঁসেলের স্বাস্থ্য কেমন! বললাম, জোগাড় এনে দাও রাঁধুনী তো আছেই তৈরী। তখনই আরেক প্রস্থ অশ্রাব্য কথাবার্তা আর ভাল লাগেনা। বাজারে এত ধার দেনা করে রেখেছে বিক্রম যে কলিং বেল বাজলে আমার হার্ট বিট বেড়ে যায়। কতকিছুই যে দেখলাম। একজন তার পাওনা শোধ করার জন্য বিক্রমকে বলেছিল তার থার্ড রেট হিন্দি ছবিতে উচ্ছলা এক নায়িকার কাজ করার জন্যে তাতে নাকি অনেক লিবারাল সিন থাকবে তবে বিক্রমের আপত্তি করার কিছু নেই কারণ ওর দেনা অনেক। কিন্তু বেঁকে বসল আমার মেয়ে। তার জন্যে খুব মার খেয়েছিল বাপের হাতে। তিতলিই সেদিন আমাকে বাঁচিয়েছিল। মেয়ে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেওয়াতে বিক্রমের জেদ কমেছিল। শত হলেও বাবাতো, তাই। কিন্তু আমার মনের মধ্যে কি ঘৃণার জন্ম হয়েছে সেই দিন থেকে তা কি আমি কাউকে বলতে পারব? নাঃ পারবনা। আপনাকে বিরক্ত করছি জানি তবুও আপনিই তো আমার পরম আরাধ্য ও রক্ষাকর্তা। আপনার টেলিফোন কথাগুলো মনে মনে শুনে আর আপনার লেখা পড়ে আমি জোর পাই। মানসিক সেই জোর, সেই ভাবনাই আমার অবলম্বন। সে আপনি যাই ভাবুন।

বিক্রমের শরীরও ভাল যাচ্ছেনা। কি একটা নার্ভের প্রব্লেম শুরু হয়েছে। পিঠে ব্যথা হয় সেটা মাঝে অসহ্য যন্ত্রণায় পরিনত হয় ও কি রকম বেঁকে যায়। আর সেই সময় বা তারপর ওর আচার আচরণ সব কেমন পশুর মত হয়ে যায়। এইতো সেদিন রাতে মেয়েকে কি নির্দয় ভাবে মারল। আমি থামাতে গিয়েছিলাম। তার চিহ্ন এখনও জ্বলজ্বল করছে আমার গলায়। আমি যে কি নরকে আছি তা বাইরে থেকে কেউ বুঝবেনা। আপনাকেই বা আমি লিখছি কেন? হয়ত কিছুটা হালকা হবার জন্যে। আপনি এই পৃথিবীকে জানাবেন কি সুন্দর জীবন বর্ণময় অন্তরালে। আমার শীফন বা ঢাকাই শাড়ীর সাজের আড়ালে যে কি যন্ত্রনা আমি বয়ে নিয়ে চলি সে কথা কারও জানার কথা নয়। তবু আপনাকেই লিখি। এখন শুধু সংসার চালান নয় তার সাথে বিক্রমের চিকিতসাও চালাতে হয়। এক এক বার নিউরোলজিষ্টের কাছে যাওয়া মানে অনেক টাকার ধাক্কা। আমার নিজের গয়নাগাটি যা ছিল তা প্রায় সব গেছে। তবে তার বেশীর ভাগটাই গেছে বিক্রমের ধার শোধ করতে। এখন শুধু বিক্রমের অনিয়মিত রোজগার আর আমার কৃচ্ছসাধন করার অপরিসীম ক্ষমতা দুইয়ে মিলে চলেছে। ঠাকুরকে রোজ ডাকি, যে করেই হোক মেয়েটাকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দাও কিন্তু নিজের জন্যে কিছু চাইনা, চাইতে ভাল লাগেনা। ঈশ্বর তো সব দিয়েছিলেন কিন্তু আমি আজ সব হারিয়েছি... এমনকি আমার গানও! খুব চেষ্টা করি মনের মাঝে পুরোনো গানের সুর নিয়ে বেঁচে থাকতে কিন্তু পরিবেশ এমন যে আমার গলায় গুনগুন করা সুরও এখন বেরোতে ভয় পায়। বিক্রম ভাবে আমি গান গাইলেই অনেকে আমাকে চাইতে শুরু করবে, কি অবিশ্বাস্য রকমের পজেসিভ তাই না? এই তো সেদিন রান্না করতে করতে, চঞ্চল ময়ুরী এ রাত বঁধু যেতে দিওনা, কানায় কানায় ভরে থাকা রাত বঁধু যেতে দিওনা... গানটা গুনগুন করে ভাঁজছিলাম, হঠাত রান্না ঘরে ঢুকে কি সব অশ্রাব্য কথা বলতে শুরু করল বিক্রম আমার মাথাটা খুব ঠান্ডা কিন্তু কি যে হল আমিও অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে আর পারলামনা। ব্যাস, কি থেকে কি হল কে জানে ড্রয়িং রুম থেকে কম্পিউটার টেবল থেকে ওয়েবক্যাম এর তারটা এনে আমার গলায় পেঁচিয়ে ধরে টান মারতে বাকি ছিল ঠিক তক্ষুনি কলিং বেল বেজে উঠল। বিক্রমের এক পাওনাদার বন্ধু এসেছিল আর সেই জন্যেই আই বেঁচে আছি এখনও। সেই বন্ধুর খুব বিখ্যাত এক শাড়ীর দোকান আছে গড়িয়াহাটে। নিজের একটা ব্র্যান্ড ও আছে। সেই শাড়ীর বিঞ্জাপনের জন্যে এসেছিল যদি আমি কাজটা করে দিই তাহলে আমার ফীসটা বিক্রমের দেনার বোঝা কিছুটা কম করে দেয়। সেটা কত তা যদিও বলেনি। আমি কিছুই বলার মত অবস্থায় ছিলামনা। এখনও নেই। পরে জানাব বলে বিদায় করে দিয়েছিলাম সেই রাত্রে। সহধর্মিনী আমি তাই স্বামীর সব কাজে, দেনা শোধ করাতে আমারই সিংহ ভাগ। তবে মার খাবার পুরোটাই আমার আর আমার মেয়ের। কি অবাক লাগে আমার। আমার মা বাবা কোনও দিন আমাকে একটা চড়ও মারেননি আর আজ আমার অঙ্গের ভুষন হল স্বামীর হাতে মার খাবার চিহ্নসমূহ। আমি কেন আছি এই নরকে? আমার মেয়েটার যেন কোনও ক্ষতি না হয় তাই কি? মানুষ বাঁচে তো আশায়! আমি কোন আশায় বেঁচে আছি?

এইখানে এসে সুবুদ্ধির নিজের প্রতিবাদী স্বত্তাকে অপমানিত বলে মনে হয়। চুপ করে বসেছিল লেখা বন্ধ করে। শ্রী এসে বলল, সুভা আর আমি বসে আছি চল খাবে চল। নীরবে অধরার চিঠিটা শ্রীর হাতে তুলে দিয়ে চুপ করে বসে রইল সুবুদ্ধি। শ্রীই নীরবতা ভংগ করল ন্যাশনাল উইমেন্স রাইটস কমিশনের কাছে ব্যাপারটা তোলা দরকার বলেই তাকাল সুবুদ্ধির চোখে সেই চাউনির মধ্যে এক নিস্ফল প্রচেষ্টার দীর্ঘশ্বাস এর শব্দ শুনতে পেল সুবুদ্ধি। যার বাকশক্তি একদিন কত পাহাড় টলিয়েছে আজ তারই ঞ্জ্যানাধীন এক মারাত্মক সামাজিক অপরাধ হয়ে চলেছে কিন্তু সে আজ বাকরুদ্ধ! কি অসহায় অবস্থার মধ্যে সুবুদ্ধি আছে সেটা শ্রী বেশ ভাল বোঝে। তাই আলতো করে ওর কাঁধে হাতের চাপ রেখে বলল, তুমি আবার কথা বলবে, আমি জানি...    

বরষা এসেছে। আকাশ কালই থাকে বেশির ভাগ সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। মনের আকাশ? সুবুদ্ধি কেমন আনমনা হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে আর নিজের আবৃত্তির সিডি গুলো নেড়ে চেড়ে দেখে। শ্রী এসে বলে, চালিয়ে দিই একটা এখন? সুবুদ্ধি নীরবে মানা করে। কন্ঠস্বর নিস্তব্ধ হয়ে গেলে মনের সব আনাচে কানাচে কত কি উঁকি দেয়। এটা এত ভাল করে আগে কখনও সে বোঝেনি।

চিকিতসার জন্য ভিয়েনা যাবার একটা বেশ ভাল প্রস্তাব এসেছিল শ্রীর অফিসের সরকারী চত্বর থেকে। ন্যায়সঙ্গত পথেই। শ্রী কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদে আসীন কিন্তু সুবুদ্ধি কোনও আলোচনা করার অবকাশ রাখেনি। একটা চিরকুট লিখে শ্রীকে শুধু প্রশ্ন করেছিল, এদেশ থেকে ডাক্তার গিয়ে আমেরিকার বা বিভিন্ন দেশের চিকিতসা ব্যবস্থা চালু রেখেছে আর তুমি চাও যে আমি আমার দেশের ডাক্তারদের অপমান করি...? যা হবার এদেশেই হবে। এদেশ যদি তাকে জীবনের বিভিন্ন সোপান পার করে এনে এই পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে থাকে তবে এদেশেই তার সুস্থ হবার ব্যবস্থা আছে – এই বিশ্বাসই সুবুদ্ধি রাখে। কথা বন্ধ হলে কি হবে, শ্রী জানে সুবু যা করে ভেবেচিন্তেই করে। মাথাটা খুব পরিস্কার। আশঙ্কার মধ্যে আছে শ্রী তবুও আর কথা বাড়ায়নি। শ্রী’র আরেক চিন্তার কারণ হল এই মানুষটার চুপ করে থাকা মানে অনেক মানুষের মুস্কিল আসানের জীবন, ঘটী ডোবেনা তাল পুকুর হয়ে যাওয়া আর সেটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা। সুবুদ্ধির এই অসহায় অবস্থাটা যে কি তা শ্রী জানে তাই খুব চেষ্টা চালাচ্ছে যদি কোনও ভাবে ওঁকে আবার কথা বলানো যায়।

অধরাকে নিয়ে লেখার কাজ শেষ করতে চায় সুবুদ্ধি। আজ আবার অধরাকে নিয়ে লিখতে বসেছে। একটা চিঠি খুলে পড়ল। খামের মধ্যে রাখল। আবার খুলে পড়ল। কি এক অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। অধরা কবিতা লিখেছে আবার, সুন্দর...

দিশা

কে গো তুমি

আমায় আবার জাগালে

জাগ্রত সত্বা আমার

খুঁজে ফেরে তোমায় বারবার

কাছে এসেও ফিরে ফিরে যাও

আসতে পারনা কি চিরতরে

এই প্রাণের নাগালে

আমি যে আমি

ভুলেই ছিলাম প্রায়

কত যন্ত্রণা সয়েছি

বিষাক্ত ক্ষত সারা গায়ে

তুমি দেখালে নতুন দিশা

জাগালে নতুন আশা

বলেছ মনকে ঊজ্জীবিত কর

ফেলে দাও এই হতাশা

বেশ তো আবার হোক নব সূর্যোদয়

আর কোনও দ্বিধা দ্বন্দ্ব নয়

নব নব রূপে যা কিছু সৃষ্টি

আমার মন ভেজানো বৃষ্টি

সে তো আমার নয়

সে তোমারই জয়।

 

এই কবিতা পড়ে সুবুদ্ধি কি কিছু ইঙ্গিত পাচ্ছে? কার কথা বলেছে সে? কে সে? সুবুদ্ধি নিজে জানে সে কিছুই করে উঠতে পারেনি অধরার জন্য। তবুও তার এত বিশ্বাস! এই মহিলার কপালে কত দুঃখ আছে আর? চারিদিকে অধরার হতাশার প্রয়াগ সন্মেলন আর সে কিনা টেলিফোনে আর বিরল চ্যাটে কিছু কথা তাই নিয়ে জীবন যুদ্ধে নতুন করে ব্রতী হয়েছে! এই কি জীবন? এই কি ভালবাসা? সুবুদ্ধি চুপ! কিন্তু ভাবনাহীন নয়।

ধীরে ধীরে সে অধরার আরেকটি কবিতা পড়ে।

 

স্বগোতোক্তি

 

একা একা পথ চলা

নিজের সাথে কথা বলা

তুমি আমি আছি সুখে তাই কি হয়

এ’ কি খরগোশের মত ভান করা নয়?

মৃত প্রাণে বাঁচার খেলা

বাঁচার আশা হেলা ফেলা

একা দ্বীপে বাস করি

ও’হে বলে যাও

একটু হাতটা বাড়াও

কোথায় আমার ইচ্ছে তরী

পাড়ি দেবো ঐ সাগরে

দামাল ঝড়ে সেই গভীরে

নিয়ে যাবে মোরে ঐ সূদূরে

দোহাই তোমার বন্দী রেখোনা আর পিঞ্জরে

পরিত্রাণ কর মোরে হে ঈশ্বর

নশ্বর দেহের মাঝে আত্মা অবিনশ্বর।

 

কি ভাবছে অধরা? কি ভেবে এই লেখা? কিছুই জানার উপায় নেই। আবার কলম ধরেছে সুবুদ্ধি নিজের ইচ্ছায়, কাউকে জিঞ্জাসা করে তো নয়। অধরা কেন চিঠি লিখছে সেটা সে’ কিছুটা বোঝে। একটা জানালা খোলা রেখে তার মধ্যে দিয়ে সে তার মনের কষ্ট লাঘব করতে চায়। করুক না। সুবুদ্ধি মনে মনে অধরার বন্ধু।

 

বন্ধু মানে মেঘলা দুপুর শিশির মাখা ভোর।

বন্ধু মানে মনের মাঝে কোথাও একটু জোর।

বন্ধু মানে স্বল্প কথা একটু অভিমান।

বন্ধু মানে মনের মাঝে কোথায় একটু টান।

 

সুবুদ্ধি জানে বন্ধুত্ব কি রকমের পাগল করা রোমান্টিসিজম! তার প্রাণের বন্ধু সন্টুকে ওরা যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনের কোলাপ্সিবল গেটের মাঝে চেপে ধরে মাথাটা থেঁতো করে মেরে ফেলেছিল আর সে কিছুই করতে পারেনি। সেই শোকের থেকে আজও বেরোতে পারেনি। সন্টুকে বাঁচাতে পারেনি। সন্টুর সাথে কথা হয় একান্তে আজও। সন্টু প্রশ্ন করে – “কেমন আছিস ফাইটার?“ সুবুদ্ধির ডাকনাম। সন্টুর শেষ কৃত্যও হয়নি। মাসীমার সামনে যাওয়ার সাহস হয়নি গত পঁয়ত্রিশ বছরে। মাসীমা কি বেঁচে আছেন? তাও জানেনা সে। সপ্রতীভ সুবুদ্ধির আরও কিছু অন্ধকার দিক আছে। সন্টুকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে সেদিন দুটো প্রাণ যেত। তখন এক একটি প্রাণের প্রয়োজন ছিল ভীষন। আর সুবুদ্ধিদের নিঃশেষ করতে আর সেই নতুন প্লাবনকে রুখতে ওরা নেমেছিল সদলবলে সশস্ত্র সঙ্গে ছিল পুলিশ – নৈতীক ভাবে ওরা হেরে গিয়েছিল অনেক আগেই, পারেনি সেই প্লাবন রুখতে তাই হত্যালীলা শুরু করে দিয়েছিল। সেই হত্যা লীলার শিকার যারা হয়েছে তাদেরকে ওরা হালাল করা মুর্গির থেকে বেশি কিছু মনে করেনি সেদিন। তাই আজও ধিকিধিকি ছোট বড় স্ফুলিংগ জ্বলছে সারা দেশ জুড়ে। যদিও আন্দোলনের চরিত্র বদলে গেছে। যাবেই কারণ লক্ষ্য এখন অপরিষ্কার। নতুন প্রজন্ম জানেনা সেই আন্দোলনের ইতিহাস।

 

বিনা টিকিটের ট্রেন যাত্রি হয়ে কবে যে কখন মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত প্রান্তরে কিম্বা পুরুলিয়া বাঁকুড়ার গহীন জঙ্গলে দিন কাটানোর অভ্যাস করে ফেলেছিল সুবুদ্ধি সে নিজেও জানেনা। দাঁড়াশ সাপের পোড়া মাংস আর আধসেদ্ধ মাইলোর কাত্থ খেয়ে প্রাণটুকু ধরে রাখা আর খবরের আশায় এদিক ওদিক চেয়ে থাকা। পুকুরের জল খেয়ে বেঁচেছিল। মাঝে একদিন মহুয়া খেয়ে আদিবাসীদের সঙ্গে নাচা, প্রয়োজন তখন বাঁচা।

প্রাণ বাঁচানোর জন্যে তখন কি না করতে হয়েছে! সুবুদ্ধির এখনও মনে হয় সেই আদিবাসীরা ওকে ভালবেসে ফেলেছিল। ওকে আড়াল করে রাখত ওরা। তাই যেদিন প্রাণ বাঁচাতে রাতারাতি ডেঁরা ও অঞ্চল বদল করতে হয়েছিল সেদিন ওদের সকলের চোখে এক কাতর আকুলতা দেখেছিল সুবুদ্ধি। সে যেন না চলে যায় ওদের ডেঁরা থেকে কিন্তু তাকে যেতে হয়েছিল। তাকে যেতে হয়েছিল, পালাতে হয়েছিল। দিনে এক জায়গায় আবার রাতের আরেক জায়গায়,  সে এক অনিশ্চিত জীবন! সেই হত্যালীলার কষাইদের হাত থেকে বাঁচতে প্রায় বুকে হেঁটে, সাইকেল করে রাতারাতি মধুপুর, গিরিডী আরও কত জায়গা ঘুরেছে সে। অনেক দিন পরে পরে নেতাদের সাথে যোগাযোগ হত আর শুনত কতজন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এই কমাসে। নিজেকে কিরকম অকিঞ্চিতকর লাগত। কেন এই বেঁচে থাকা? কেন এই পালিয়ে বেড়ানো? এর থেকে ওদের কয়েকটা কে শেষ করে নিজের প্রাণ আহুতি দেওয়া ভাল কিন্তু নেতৃসঙ্কুলের আদেশ। আন্ডার গ্রাউন্ড হয়ে যাও।

শেষমেষ যখন যখন নিজের শহর কলকাতায় ফিরতে পারল সুবুদ্ধি তখন অনেক বড় বড় মস্তিস্ক নিলাম হয়ে গেছে। আর যারা নিলাম হতে চায়নি তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। হত্যালীলা স্তিমিত কিন্তু স্তব্ধ নয়। প্রথমদিন ইউনিভার্সিটিতে এসে নিজেকে