বৃষ্টি নীল জল
ধারাবাহিক উপন্যাস
(পর্ব ১-৫)
~~ নীল ~~
jodi_bolo@yahoo.com
© লেখক
১
রিমি কাজলদানীর দিকে তাকিয়ে আছে। কাজল চোখে দেবে? নাকি দেবে না? সে কোন একটা সহজ সিদ্ধান্ত সহজে নিতে পারে না। একটু দোনোমনো ভাব করে সে কাজলদানীটা তুলে নেয়। এটা তার নানীর। তারপর মা’র। তারপর রিমির। সে আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো কাঠের কারুকাজ করা কাজলদানীটার দিকে। তারপরে খুব যত্ন করে কাজল দিল দুচোখে। দুই ভ্রূর মাঝে ছোট কালো টিপ। দুই মিনিটের তাড়াহুড়োর মাঝে ব্যাগের টুকিটাকি সবকিছু গুছিয়ে নিল সে।
বাসা থেকে বের হয়ে দেখে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিপড়া শুরু হয়েছে। ছাতা আনা উচিত ছিল। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সে মেঘের গর্জন শুনেছিল। সে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মাঝেই রিক্সা নিল। হুড ফেলে এবার ঠান্ডা মাথায় ভাবতে থাকে। সে যে স্বাধীনতাটা নিয়েছে সেটা কি ঠিক? সে বিরক্তিতে কপালের ভ্রূ কুচকায়। তার চব্বিশ বছরের মাথায় কিছু ঢুকছে না। বিয়ে। জীবনের সহজ কোন সিদ্ধান্ত নয় যে সহজে নেবে। সাদা নাকি কালো জুতা পড়বে এই চিন্তায় তার যেখানে আধঘন্টা সময় যায় সেখানে সে এক রাত্রির মাঝে কি করে এতবড় একটা সিদ্ধান্ত নিল সে জানে না।
হৃদয় জি ই সি’র মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় আধঘন্টা। সে শান্ত ভঙ্গীতে সিগারেট টানছে। আর মাঝে মাঝে তার সাদা পাঞ্জাবীর ডান পাশের এক টুকরো ছেঁড়া অংশের দিকে উদাসভাবে তাকাচ্ছে। রিমি দেখলে খুব রাগ করবে। কিন্তু তার কি দোষ। রিক্সাতে উঠার সময়ে টান লেগে এই অবস্থা। কিন্তু রিমি সেটা বুঝবে না। এই দুনিয়াতে যদি মেয়ে জাতিটা না থাকতো তবে কতই না ভালো হতো। সে ভাবে। মানিব্যাগ বের করে ৫০০ টাকার সবেধন নীলমণি নোট টাকে এক নিজির দেখে নেয়। তার অফিস থেকে তিন মাসের বেতন এখনো দেয় নি। রিমি জানে না। জানলে অহেতুক চেচাঁমেচি করবে যেটা হৃদয়ের একটুও ভালো লাগে না। বোকা আর মাথাগরম মেয়েমানুষ। সে গুন গুন করে একটা গানের সুর গলায় আনতে চেষ্টা করে’আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান’। গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মাঝে তার হঠাত এই গান কেন মইনে আসলো সেটাই সে ভেবে পায় না। রিমিকে আজ সত্যিই সে বিয়ে করে ফেলবে? তার আরো কিছু সময় দরকার ছিল। এখনো সে নিজেই ঠিকমতো চলতে পারে না। রিমির বাবার উপরেই তার যত বিরক্তি গিয়ে পড়ে। মেয়ের বিয়ে কানাডার ছেলেটার সাথে এত তাড়াতাড়ি ঠিক করার দরকারই বা কি ছিল! সে আরো জোরে সিগারেটে টান দেয়। বৃষ্টি হঠাত আরো জোরে পড়তে শুরু করলো।
আজ স্বরূপের ক্লাস ৯.৩০ থেকে। সে শাটল্ ট্রেনের ভীড়ের মাঝে কোনভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এই সাতসকালেই ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা এত এনার্জি কোথা থেকে পায় সেটা সে কোনদিনই মাথায় আনতে পারে না। এই ট্রেন শহর থেকে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যায় পঁচিশ কি.মি. দূরের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে ট্রেনের ভীড়ের মাঝে চোখ বুলায়। কিছু ছাত্র বই নয়ে মনোযোগ সহকারে পড়ছে। এদের মনে হয় পরীক্ষা।’বেচারা!’। মুখে একটা সহানুভূতির হাসি ফুটে ওঠে তার। এদের পাশেই গলা ফাটিয়ে গান গাইছে কিছু ছেলে। এরা মানুষ নাকি যন্ত্র সেটা সে মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। এই সকালবেলায়-ই গলায় এত জোর পায় কি করে! ইশ্বর এদের গলায় আরো শক্তি দিক! আজ সে ‘প্রথম ট্রেন’ মিস্ করেছে। এটা ‘দ্বিতীয় ট্রেন’ ভার্সিটি যাওয়ার। সকাল ৮.১০-এ ছাড়ে শহর থেকে। প্রথম ট্রেনে তার ক্লাসের বন্ধুরা সবাই একসাথে যায়। তাই এখন সে একা। ঘড়িতে এখন বাজে ৯.২০। সে ক্লাশে ঠিক সময় যেতে না পারলে স্যার ঢুকতে দিবে না।
ভার্সিটি ট্রেন স্টেশন। এক পাশে পাহাড়। বৃষ্টিতে ভিজে আরো সবুজ হয়েছে সবুজ গাছগুলো। তার পাশে লাল রঙের বৃটিশ আমলের স্টেশন মাস্টারের ছোট একতলা বিল্ডিং। একটা অনেক লম্বা প্রায় দুই কি.মি. সোজা রাস্তা এসে মিশেছে রাঙামাটি রোড থেকে স্টেশন পর্যন্ত। সেই রাস্তার দুধারে সারিসারি কদম আর মেহগনির গাছ। এই বর্ষায় হলুদ কদমফুলে ছেয়ে গেছে গাছগুলো। কিছু চাপাফুলের গাছ। অনেক বিশাল। সোনালী চাপাফুলের সমারোহ। তার দুপাশে অবারিত সবুজ ধানক্ষেত অনেক দূরে দিগন্ত ছাড়িয়ে মিশে গেছে দূরের পাহাড় সারিতে। এই রাস্তার নাম দিয়েছে ছাত্ররা হাইওয়ে টু হেভেন।
সেই রাস্তার এক পাশে ইউনুইভার্সিটি স্টেশনের কাছে একটা ছোট দোকান। সেই দোকানের দোকানী রমিজ পাগলা। সবাই তাকে কেন পাগলা বলে সেটা সে কোনদিন ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনি।