একাধিক একা

(ধারাবাহিক গল্প)

 রোদ্দুর

 

প্রচ্ছদঃ দেবব্রত দত্ত

প্রকাশ কালঃ নভেম্বর ২০০৭

 

http://kobitar-snanghor.blogspot.com/
http://godyer-ghorbari.blogspot.com/
http://ghumonto-onuvuti.blogspot.com/
http://www.jaxtr.com/roddoor

© লেখক

 

                        ঝুমাকে কথা দিয়ে এসেছিলাম পুরীতে এসে প্রথম লেখা কবিতা সঙ্গে দিয়ে চিঠি লিখব কবিতাও লেখা হচ্ছে না, তাই চিঠিও না আমি চিরকালের আলসে এখানে এসে যেন আলসেমীটা বেড়ে গেছে ঝড়ের মত সমুদ্রের হাওয়ায় কেবল ছুটীর গন্ধ

                        প্রথম দু-দেখার দেখে নিয়েছি দেখে নিয়েছি বলা ভুল, আমার সঙ্গীরা দেখে নিয়েছে আমি কেবল বিছানায় গড়িয়ে কাটাচ্ছি বয়ে এনেছি খান তিনেক শারদীয়া সংখ্যা একটাও ছুঁইয়ে দেখা হয়নি ঝুমাকে এতদিন দেখতে পারছি না বলে একটা মনঃকষ্টও আছে

                        অনেকটা সময় হোটেলের ঝোলানো বারান্দায় ডেক চেয়ারে বসে থাকি নিস্পলক তাকিয়ে থাকি সমুদ্রের দিকে ঢেউ গুনি গুলিয়ে গেলে আবার প্রথম থেকে গুনি চার দিন হ'ল পুরীতে এসেছি, এখনও একদিনও সমুদ্রে স্নান করিনি শুধু মুগ্ধ হয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের তান্ডব দেখেছি পলকে পলকে আমাকে বিস্মিত করে দিচ্ছে সমুদ্র আমি এই প্রথম সমুদ্র দেখলাম

                        আমার হয়ত এই আসাটাও হত না এই দলে আমার মাতৃদেব আছেন তার ল্যাং বোট হয়ে আমার আসা একটু বাধো বাধো নিজেদের কাছে কারন এই বেড়াতে আসাটা পুরোটাই অন্যের দয়ার ওপর বলি কাকু, আসলে বাবার বন্ধু ছোট বেলা থেকেই অবশ্য দেখে আসছি বিনয় কাকু কে আমাদের পারিবারিক বন্ধুই বলা যায় দুই পরিবারের মধ্যেও মেলামেশা আছে তবে আমাদের সামাজিক অবস্থান কখনই এক ছিল না এখন তো আবার অন্য এক সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে পড়েছি

 

                        আমাদের অবস্থা তেমন স্বচ্ছল কোনদিনই ছিলনা তবে শান্তি ছিল সারা দিনের পর বাড়ি ফিরলে কি যে একটা ভালো লাগা শরীর মন ছুঁইয়ে যেত বাবা চলে যাবার পর এখন সেই ভালো লাগাটা যেন আর তেমন করে অনুভব করতে পারি না বাবা হঠা চলে গেল কেউ কিছু জানতেই পারল না রাতের ঘুম আর ভাঙল না আমি দেখেছি বাবার যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া ঠোঁট কাউকে বলিনি মাকে তো নয়ই জানলে কষ্ট বাড়বে পাশে শুয়ে থাকাটা লোকটা নিঃশব্দে চলে গেল

                        বাবা ওরকমই ছিল নিজের অসুবিধের কথা কখনও কাউকে বলত না নিজেই সামলে নেবার চেষ্টা করত চলে যাবার সময় খুব কষ্ট পেয়েছে বোধহয় ডাকেনি মাকে ডাকেনি আমায় রাত দুপুরে আমাদের বিব্রত করতে চায়নি হয়ত বোঝেইনি চলে যাচ্ছে হয়ত বোঝেইনি ফেলে যেতে হচ্ছে ঘুঁণে ধরা বুক সেল্‌ফ ভরা তার সাধের কবিতার বইগুলো বাবা ভীষণ ভালোবাসত কবিতা আমাকেও কবিতা ভালোবাসতে শিখিয়েছে আমার রক্তে কবিতা বাবাই ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে

                        আমার বি কম ফাইন্যাল আর তিন-মাস পরেই কলেজের ক্লাস তো আর করা হচ্ছে না বিনয় কাকুর ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় সুপারভাইজারের কাজটা করছি বিনয় কাকুর-ই বদান্যতায় সংসারটা না হলে থম্‌কে দাঁড়াতো ছোট অফিসের যা হয় বাবার পাওনা টাকা পয়সা কবে পাওয়া যাবে জানি না

                        বাবা চলে গেছে ছ মাস হয়ে গেছে এখনও অভ্যেস হয়নি এখনও মনে হয় পাশের ঘরে বাবা আছে কোন কিছু আলোচনা করে নিই আমার এবং মায়ের এই পুরীতে আসা বিনয় কাকু আর মুক্তা কাকীমার ভালোবাসাতেই সম্ভব হয়েছে ওঁনাদের আসবার প্ল্যান আগে থেকেই ছিল বাবা চলে যাবার পর মা তো খুব একা হয়ে গেছে তাই মুক্তা কাকীমাই কথাটা তোলে মা-র হয়ত সবার সাথে কটা দিন অন্য কোথাও কাটালে ভালো লাগবে আর মায়ের সঙ্গে আমি, ল্যাং বোট তবে এখানে এসে মা-র ল্যাং বোট হয়েছে বাপ্পা বিনয় কাকুদের ছেলে সাউথ পয়েন্ট ক্লাস নাইন ভালো ক্রিকেট খেলে

                        আমার বেড়ানো খুব একটা হয়নি আমাদের তো সে অবস্থা ছিল না যে কথায় কথায় দেশ বেড়াবো বাবা একবার শান্তিনিকেতন নিয়ে গিয়েছিল তখন আমি স্কুলে পড়ি আর কলেজে এসে একবার এক্সারসানে ফলতা গিয়েছিলাম যেখানে ঝুমার সাথে আমার প্রথম আলাপ দিগন্ত বিস্তৃত নদীর বুকে পাল তোলা নৌকো ঠিক পড়র বইয়ের ছবিতে যেমন দেখেছি আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম সেই প্রেক্ষাপটে ঝুমা এসে আবির্ভূত হল আমার বুকের গভীরে খোদিত হয়ে গেল সে প্রকৃতি আমায় বেশ কাতর করে দেয় এই এখন যেমন আমি সমুদ্রের রূপ ছেড়ে নড়তেই পারছি না

 

                        আমরা বীচে বসে ছিলাম আমি মুক্তা কাকীমা আর সম্পা বিনয় কাকু গেছেন বাজারের দিকে আমাদের কোনারক ভ্রমনের ব্যবস্থা করতে বাপ্পাও গেছে সঙ্গে

                        চারিদিকে কিশোরী সন্ধ্যার অন্ধকার এদিক ওদিক ছড়ানো ছোট বড় নানান দল শামুক ঝিনুক দিয়ে বানানো মূর্ত্তি নিয়ে কিছু বাচ্চা ছেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে ড়িও আছে

                        হঠা সেই অন্ধকারে একটি দল থেকে একটি ছেলে উঠে দাঁড়াল বোধহয় কোথাও যাবে একটি মেয়ের গলা শোনা গেল, মেজদা আমার পোষ্ট কার্ডটা ফেলে দিস্‌ ফেলে দিস মানে অবশ্যই ওয়েষ্ট পেপার বাস্কেটে নয়, ডাক বাক্সে

পোষ্ট কার্ডের কথা শুনে ঝুমাকে চিঠি লেখার কথা মনে পড়ল কিন্তু ওকে কথা দিয়ে এসেছিলাম, এখানে এসে প্রথম লেখা কবিতা দিয়ে চিঠি লিখব ধুর্‌ ওসব কবিতা ফবিতা শীগ্‌গিরি বেড়োবে বলে মনে হয় না আজ  হোটেলে ফিরে ওকে একটা চিঠি লিখে ফেলব

সম্পা বালি দিয়ে একটা মূর্ত্তি বানাচ্ছিল আমাকে ডেকে বলল, দেখ্‌রঞ্জু দা, পারবি এরকম?

সমুদ্র থেকে মুখ ঘুরিয়ে আধো অন্ধকারে সম্পার বানানো শিল্প কর্মটি দেখলাম বললাম, কি এটা?

ও বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলল, এটার নাম দেব একটি মুখ

    - মুখ তো আমিও বুঝতে পারছি, কিসের মুখ সেটাই তো বুঝতে পারছি না

প্রথম বর্ষের ছাত্রী সম্পা ছেলেমানুষের মত হাত নাড়িয়ে বলল,  এ মা দেখেছো!

                        মুক্তা কাকীমা গুন গুন করে গান গাইছিল কাকীমা  খুব ভাল রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে  পারে গান গাইলেও আমাদের কথা শুনছিল এবার গান থামিয়ে হেসে উঠল আমিও হাসতে হাসতে বললাম, আচ্ছা কাকীমা তুমিই বলত এটা কিসের মুখ?

    - রঞ্জু দা খারাপ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আমি এবার উঠে যাব

                       

আমি আর কাকীমা হাসতেই লাগলাম সম্পা রেগে গিয়ে হাত দিয়ে মূর্ত্তিটা ভেঙে দিল আমাদের হাসির রেশ তখনও যায়নি, দেখলাম চাঁদ উঠেছে, তিন দিন পরেই পূর্ণিমা

                        সম্পার রাগ ভাঙানো হয়ত কষ্ট হত বিনয় কাকু এসে যেতে আবহাওয়াটা স্বাভাবিক হয়ে গেল বাপ্পা নিঃশব্দে আমার পাশে এসে বসল ও দেখলাম ঘন ঘন বাজারের দিকে তাকাচ্ছে

    - কালকে গুমোট ছিল আজ বেশ হাওয়া দিচ্ছে, বলতে বলতে বিনয় কাকুও বসল

মুক্তা কাকীমা বলল, চাঁদটা যেন আজকে বেশী চক্‌চক্‌করছে

-          কাকু কোনারকের বাস বুক করে এলে?

-          হ্যাঁ আমরা পরশু যাব কাল খুব ভাল করে একচোট স্নান করব ভাবছি

-          সে তো রোজই করছ কাকীমা বলল

-          না সমুদ্রের অবস্থা ক্রমশঃ খারাপের দিকে পূর্ণিমা এসে গেলে স্নান করা খুব অসুবিধে হবে

-          রঞ্জু তোকে কাল জলে নামাব কাকীমা বলল

-          আমার এসব বালি টালির মধ্যে স্নান করতে ভাল লাগে না

-          হোটেলে ফিরে আর একবার করে নিবি?

-          ধুর্‌

-          একবার নেবে দেখ, তারপর আর উঠতে ইচ্ছে করবে না

কথাটা বোধহয় ঠিক কারণ এতদিন দেখছি তো, যেই নামছে, ঘন্টা খানেকের আগে কারোরই জল ছেড়ে ওঠার নাম নেই বললাম, সে কালকে দেখা যাবে

কিরে সোনা, তুই কোন কথা বলছিস না তো?

সম্পাকে কাকু সোনা বলে ডাকে সম্পা চুপ করে বসে আছে তার মানে ওর রাগ এখনও যায়নি কাকীমা আগের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় হাসতে শুরু করে সঙ্গে আমিও কাকু বলে, কি ব্যাপার তোমরা হঠা হাসতে শুরু করলে?

কাকীমা হাসতে হাসতেই বলল, সম্পা বালি দিয়ে একটা মূর্ত্তি বানিয়েছিল, রঞ্জু তাই নিয়ে ক্ষেপিয়েছে, তাই - কাকীমা কথা শেষ করতে পারে না হেসেই চলে

কাকু বলে ও এই ব্যাপার সোনা তুই আর একটা কিছু বানা তো দেখি তোকে কে কি বলে এরা সব অর্বাচিন তোর শিল্প কর্ম বুঝবার ফান্ডা এদের নেই

বাবা, তুমিও শুরু করলে? সম্পার ঠোঁট ফুলে উঠল

আমি বললাম, সম্পা এত সুন্দর চাঁদ উঠেছে, তুই একটা গান কর

সম্পার গান শেখা কাকীমার কাছ থেকেই ভালোই গান গায় কাকু কাকীমাও আমার কথায় তাল মেলালো, হ্যাঁ সোনা একটা গান কর আমাদের অনুরোধের বিপক্ষে ওর অভিমানকে বেশীক্ষণ টিকিয়ে রাখতে পারল না শেষে রাজী হল

সম্পা বলল, আগে আমায় ঝাল মুড়ি খাওয়াও

কাকু বলল, ঠিক আছে, এক্ষুণি খাওয়াচ্ছি

-          না তুমি খাওয়ালে হবে না রঞ্জু দা খাওয়াবে

বাপ্পা ছাড়া আমরা সকলেই জোরে হেসে উঠলাম বাপ্পা যেন একটু আনমনা ও দেখলাম তখনও বাজারের দিকে তাকিয়ে আছে

 

 

হাতের টাচিটা ডান হাত থেকে বাঁ হাতে নিল অনুপমসুদৃশ্য কাফ-লিঙ্কস লাগানো জামার হাতা সরিয়ে সময় দেখলকুড়ি মিনিট হয়ে গেল সে বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে আছেআরো কত কুড়ি মিনিট যে দাঁড়াতে হবে কে জানেএর মধ্যে একটা বাস আসেনি নয় তবে সেগুলোর যা অবস্থা কোলকাতার কাউকে তা নতুন করে বলতে হবে না এই যেমন এই মাত্র ঠাসানো মুড়ির তিন ধুক্‌তে ধুক্‌তে এক কাত হয়ে এসে দাঁড়াল

            অনুপম রোজ পাতাল রেলেই যাতায়াত করে ভীড় হলেও সেটা অনেক সহনীয় কিন্ত বাসের ভীড় এখন আর সহ্য করতে পারে না সে কলেজ জীবনে বাসের পা দানিতে ঝুলে ঝুলে যাওয়াই ডভেঞ্চার ছিল বাস কন্ডাক্টার থেকে বয়স্ক যাত্রী কারো অনুরোধ বা ভর্তসনাকে পাত্তা দিত না তারা এখন আর সে অভ্যেসও নেই, এই অফিস বাবুকেও মানায় না

            বাধ্য হয়ে আজ বাসের সরণাপন্ন হতে হয়েছে তাকে ভবানীপুর স্টেশনে একটি যুবক হঠাৎ লাফ দিয়ে আঁকড়ে ধরে থামাতে গেছে চলন্ত ট্রেনটাকে তার কি আর এই গতি ভালো লাগছিল না? না কি সে সে পিছিয়ে পড়েছিল? তাই সে নিজেকে জুড়ে দিতে চেয়েছিল সেই গতির সাথে? চারপাশের সময়টা বড় দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে

            অনুপম একটু অন্যমনস্ক ছিল বাসটা কখন এসেছে দেখেনি বীভস ব্রেকের আওয়াজে সে কিছটা চম্‌কে ওঠে এ বাসেও উঠতে পারবে না ভেবেই দরজার দিকে একবার তাকায় সেখানে তখন পাণিপথের যুদ্ধ চলছে হঠাৎ অনুপমের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে সে লক্ষ্য করে বাসের জানালায় একটি মেয়ে তাকে দেখছে বড় বড় দুটো চোখ নিস্পলক তার দিকে তাকিয়ে আছে

            ঠোঁটের ওপর আলগোছে নেমে আসে একটা দীর্ঘশ্বাস কিন্তু বুক ভরা আনন্দ তার মনে হল বহু কষ্টের মধ্যেও ছুটে গিয়ে আঁকড়ে ধরে দরজার হাতলটা পা দুটো পাথর হয়েছিল, চোখ দুটোও

            অনুপমের বয়স ত্রিশ মাথা ভর্তি কোঁকড়া চুল ঠোঁটের ওপর চওড়া গোঁফ চোখে কালো ফ্রেমের চশমা অনেক মেয়েই তার দিকে ফিরে ফিরে তাকায় তবু  আজকের এই ব্যাপারটায় অন্য কিছু ছিল এখানেই এর শেষ নয়

            অনুপমের বাড়ি রাসবিহারী অঞ্চলে পার্ক স্ট্রীটের কাছাকাছি ওর অফিস বাসের আশা ছেড়ে, সে এস্‌প্ল্যানেডের দিকে হাঁটতে শুরু করল সেই চোখ দুটো এখনও বুকের মধ্যে পিং পং বলের মত এদিক ওদিক মাতামাতি করছে পেছন ফিরে সে দেখল বাসটা অনেক দূরে চলে গেছে তার এখন হাঁটতে একদম ভালো লাগছে না ইস্‌এখন যদি চেনা কেউ এখান দিয়ে গাড়ি নিয়ে যেত আর জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলত, ‘এই অনুপম?’

            অনুপম চম্‌কে উঠল ভাবার সঙ্গে সঙ্গেই সে শুনল, ‘এই অনুপম’

            চিন্তার খেই ধরে সে রাস্তার দিকে তাকাল না কোন গাড়ি এসে থামেনি ভুল শুনেছে বোধহয় আর তাছাড়া এতগুলো লোকের মধ্যে শুধু কি তারই নাম অনুপম হতে পারে? সে থামেনি হাঁটছিলই আবার শুনল, এই অনুপম? এবার একেবারে ঘাড়ের কাছে সে থামল ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সলিল সলিল ওর কলেজ জীবনের বন্ধু কলেজ ছাড়ার পর কর্মের খোঁজে কে যে কোথায় ছড়িয়ে পড়ল তবু সলিলের সঙ্গে বন্ধুত্বএখনও গাঢ় প্রায়ই ওদের দেখা হয়

            অনুপম ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আরে সলিল, এখানে কি করছিস্‌?

            সলিল প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে অনুপমের কাঁধে একটা চাপড় মেরে বলল, কি ভাবছিলি বলত?

-          কই কিছু না তো?

-          আমি তোকে কখন থেকে ডাকছি

-          এই বাস ট্রামের আওয়াজ -

অনুপম কি ভাবছিল? কিছুক্ষণের জন্যে থেমে থাকা পিং পং বলটা আবার নেচে উঠল নাঃ বাসটা আর দেখা যাচ্ছে না তবে, তবে -

হঠা বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল যেন নিঃশব্দে ধ্বক্‌করে ওঠা নিজের ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে ঝুমা আনমনেই বলে ফেলল, ইস্‌, তোমায় যদি পেতাম

স্টপেজে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির চোখে চোখ পরতেই তাড়াতাড়ি চোখ ঘুরিয়ে নেয় সে তবু বুঝতে পারে সেই চোখ দুটো এখনও তার দিকেই চেয়ে আছে সে দৃষ্টিতে অনেক আকূলতা

কনুইয়ের ধাক্কা দিয়ে পাশে বসা রত্না কানের কাছে ফিস্‌ফিস্‌করে বলল, তোর দিকেই তাকিয়ে আছে

-          কে? যেন কিছুই জানে না ঝুমা

-          আহা ন্যাকামী কোরোনা, দারুন  হ্যান্ডসাম কিন্তু চ আলাপ করি

-          ভ্যাট তা হয় নাকি?

-          আগে চল

বাস ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে ঝুমার মনেও তাই ইচ্ছে ছিল যেন সামনের স্টপেজেই নেমে যায় রত্না আর একবার বলতেই বলল, সত্যিই যাবি?

-          অফকোর্স

দুজনে সীট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সীটের ওপর ঝুঁকে থাকা ভীড়টায় একটু যেন নাড়া পড়ল এসব জায়গায় নামা খুব শক্ত সাধারনতঃ এই অফিস টাইমে, এসব জায়গা থেকে লোক ওঠেই, কেউ বিশেষ নামে না তাই ওদের নামতে বেশ কষ্ট হল নামতে হল টেনে হিঁচড়ে বাসটা ছেড়ে দিল গেটে ঝোলা লোকগুলো, অনেকক্ষণ ওদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল

ঝুমা শাড়ি ঠিক করতে করতে বলল, কি পাগলামী হচ্ছে বলত?

-          চুপ কর্‌, আগে চল্‌তো তারপর দেখা যাবে

তাড়াহুড়ো করে নেমে পড়ল বটে, এখন কাজটা ভীষণ ছেলেমানুষী মনে হচ্ছে ঝুমার ও বলল, এই রত্না এতে নিজেদের কিন্তু খাটো করা হবে বিশ্রী ব্যাপার হবে আমার একদম ভালো লাগছে না

-          আরে বাবা, সে জন্যে নামিনি তুইও যেমন, ওরকম কারো সাথে আলাপ করা যায়? ইস্‌উনি একদম গদগদ দু পলক তাকিয়েছে, আর কি? তুই এই বুদ্ধি নিয়ে রঞ্জু দার সাথে প্রেম করছিস? ছেলেদের একটু না নাচালে মেয়েদের দাম থাকে না

ঝুমার এসব কথা জানা পুরোনো কথা শুনতে ভালো লাগছিল না বিরক্ত হয়ে বলল, তবে তুই কি জন্যে নামলি?

রত্না কৌতুক করে বলল, হঠা আজকের বিকেলটা মনে হল খুব সুন্দর